২০-ই এপ্রিল-এর পর থেকে সারা ভারতে কোভিড পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছে। এই সেকেন্ড ওয়েভ নিয়ন্ত্রণে জারি হওয়া সরকারি বিধিনিষেধগুলির কারণে অরেঞ্জ ডিজিট্যাল-কেও কাজে সাময়িক ছেদ টানতে হয়েছে। তাই আমরা লাইভ স্ট্রিমিং এখন স্থগিত রেখেছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই আবার আমরা অনলাইন হবো। সহযোগিতার জন্য দর্শক বন্ধুদের ধন্যবাদ জানাই।.

ORANGE DIGITAL

রসে রঙ্গে তোমার সঙ্গে

Cine সমাচার

সিনেমা জগতের ওঠা পড়া, অতীত ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রতিবেদন

বিশেষ প্রতিবেদন

সিনেমা আবার সুপারহিট হবে, কবে?

হিট, মেগাহিট, সুপারহিট! বছর বছর ধরে চলে আসছে এই ম্যাজিক শব্দগুলো। যা আসলে সিনেমা জগতে সাফল্যের নানা মাপকাঠি। কিন্তু করোনার সঙ্কট সময় জাঁকিয়ে বসেছে আজ। ২০২০ আর ২০২১, দুটি বছরেই লক ডাউনের কবলে পড়ে লম্বা সময় ধরে সিনেমার শো বাতিল রাখতে হয়েছে সিনেমা হল গুলোকে। ফলে আজকের নিউ নরম্যাল-এ সিনেমার সাকসেস-এর শেষ কথাটাও গেছে বদলে। এটা একটা নতুন বদলের চ্যালেঞ্জ বটে। তবে শুরুর দিন থেকে একটু একটু করে অনেক কিছু এমনিতেই বদলেছে সিনেমা বাণিজ্যিক সাফল্যের ধরণে। ধাপে ধাপে কি রকম সেই বদল, পঞ্চাশ বা ষাটের দশক থেকে? চলুন, সেটাই আগে দেখা যাক। তারপর করোনা সময় আর ভবিষ্যতের সিনেমার কথায় ফেরা যাবে না হয়।

একটা সময় ছিল সোজা হিসেব। তখন শুধু গুনতে হতো দিন আর তাই শুনতে হতো 25 days, 50 days, 100 days…Silver Jubilee…Golden Jubilee…এই সব কথাগুলো। পুরনো দিনের লোকেরা জানেন, এই শব্দগুলো বড় বড় করে print করে সিনেমার স্পেশ্যাল পোস্টার ছাপানো হতো আট দশ বছর আগেও। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে যেমন আয়ু বাড়তো সিনেমার সেরকম নতুন পোস্টার পড়তো দেয়ালে দেয়ালে।
মানে, সিনেমা Hall-এ যে ছবি যত বেশি দিন চলবে, সেটা ততো বড় হিট। সোজা হিসেব!
কিন্তু তারপরে ট্রেন্ডটা একেবারে চেঞ্জ হয়ে গেল 2000 সালে নতুন মিলেনিয়াম শুরু হতে। এই সময় এলো সাকসেস-এর নতুন মাপকাঠি।
আসলে, এর আগে অবধি না তো ছিল মাল্টিপ্লেক্স না ছিল টিভিতে এতো এতো মুভি চ্যানেল। আর বড় স্টার কাস্ট এর ভালো মুভি গুলো তখন রিলিজ হতো অনেকদিন পরে পরে। ফলে, হলে যখনই নতুন ছবি আসতো সেই সময় তার টিকিটের জন্য সিনেমা হলে ধাক্কাধাক্কি, ঠেলাঠেলি, মারপিট হতো দেখার মতো।

৯০-এর দশক অবধি এমন জমজমাট প্রিমিয়ার শো-তে স্টার-রা হাজির হতেন বড় ছবির রিলিজ উপ্লক্ষ্যে। ১০ বছরের মধ্যে ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে যায়

আজকে আর সে সবের সিন নেই। লক ডাউনের আগের যুগে এটা একটা নিয়মেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে উইক এন্ড আর ছুটির সময়কেই টার্গেট করবে বড় ছবিরা। মাল্টিপ্লেক্স জমানাতে আগের যুগের মতোই সিনেমা রিলিজ ডে ফ্রাইডে। কিন্তু তার ব্যবসার জন্য সেই উইকএন্ড-এর শনিবার এবং রবিবারটাই নাকি সব চেয়ে বেশি ইম্পরট্যান্ট। সপ্তাহান্তে ছুটির দিনেই সিনেমা হল বেশি ভরা। টিকিটের দামও তাই অনেক বেশি চড়া!
মানে, কি দাঁড়ালো? সিনেমার সাকসেস-এর শেষ কথা ওই তিন দিন মোটে! পরের সপ্তাহে আরেকটা নতুন মুভি চলে আসবে আর আগেরটাকে তখন সবাই বেমালুম ভুলে যাবে! সিনেমার race for success শেষ অবধি তখন থেকে ঠেকলো এসে, কম দিনে বেশি টিকিট বিক্রি-র ফর্মুলায়! সাফল্য মাপতে তাই স্বাভাবিক ভাবেই বক্স অফিস কালেকশন নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিলেন ব্যবসার পণ্ডিতরা। এলো নতুন ট্রেন্ড, কোটি টাকার ক্লাব! উইক এন্ডে-এ বা হলিডে সিজন-এর সময় মাল্টিপ্লেক্স-এ মানুষের ভিড় প্রতি বছর যতো বাড়তে লাগলো, সিনেমার ব্যবসায় তত বড় বড় জাম্প দেখতে লাগলাম আমরা। 100 Crore Club, 200 Crore Club, 300…400…এভাবে চলতে চলতে highest record শেষ অবধি কোথায় গিয়ে পৌঁছোতো…কে বলতে পারে?

টিকিটের লাইনে মারপিট বা সিনেমা হলে ঢোকার সময় এমন লম্বা লাইন, এটা সিংগ্ল স্ক্রিন-এ দেখা যেতো

এভাবে চলতে চলতে 2020 সালের লকডাউন একটা বিরাট জোর ধাক্কা। সিনেমার দুনিয়া পুরো ওলটপালট। কারণ প্রায় আট মাস ধরে সিনেমা হলের সব শো বন্ধ ছিল।
গুণে শেষ করা যাবে না যে কত সিনেমা এই মুহূর্তে রিলিজ হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে। Lock Down শেষে এসেছে New Normal. সিনেমা হল চালু হয়েছে বটে, কিন্তু 2021-এ সিনেমা শো-তে শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছিল হাতে গোনা দর্শক। সেই সংখ্যা এতোই কম যে বিগ বাজেট মুভি রিলিজ করার আগে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যাচ্ছে প্রোডিউসারদের কপালে। হলে রিলিজ-এর ফল আদৌ ভালো হবে কি না, একদিকে রয়েছে সেই কনফিউশন। আরেকদিকে সিনেমা রিলিজ না করে বাক্সবন্দী রাখাই বা যায় কতদিন? তাতেও যে অনেক ক্ষতি। এদিকে 2021-এর এপ্রিল থেকে করোনা দ্বিতীয় ঢেউ সারা দেশে এমন বেসামাল পরিস্থিতি শুরু করলো যে আবার খানিকটা লক ডাউনেরই মতো পরিবেশ বেশিরভাগ রাজ্যে। অবস্থা এত অনিশ্চিত যে ঈদের মরশুমে সলমান খানের “রাধে” পর্যন্ত এবার বিশেষ সুবিধা করতে পারলো না সিনেমা হল রিলিজে।
সিনেমা হলে যে খুব শিগগিরি আবার হাউসফুল বোর্ড ঝুলতে দেখা যাবে না, সেটা এখন সবাই বুঝতে পারছেন। তাই সিনেমা হলের বদলে OTT প্ল্যাটফর্মের দিকে সরতে শুরু করেছে নজর। 2020-তে সিনেমা হলে রিলিজ হওয়ার কথা ছিল এমন প্রায় এক ডজন মুভি শেষ অবধি রিলিজ হয়েছে OTT প্ল্যাটফর্মেই। সেখানে বরুণ ধাওয়ান, অমিতাভ বচ্চন, রাজকুমার রাও, ভূমি পেডনেকর-এর মতো স্টারদের মুভিও বাদ নেই। 2021-এর ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট। সেখানে ছয়খানা পুরস্কার জিতেছে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ছবি “গুলাবো সিতাবো”। যে ছবি রিলিজ হয়েছিল OTT প্ল্যাটফর্মে! মানে, এখন আর বলা যাবে না যে ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড জিততে হলে সিনেমা হলে ছবি রিলিজ হওয়া আর আবশ্যক রইলো!
বিগ বি স্বয়ং কয়েকদিন আগেই টুইট করেছেন ৭০-এর দশকে তার কেরিয়ার তুঙ্গে থাকার সময়ের একটি মুভি প্রিমিয়ারের ছবি। আর সেখানে তিনি লিখেছেন, এমন দিনগুলি আর কোনদিনই ফিরবে না।
আমরা সাধারণ দর্শকরা তাহলে কি ধরে নেবো? বড় পর্দার সিনেমার সাকসেস কাহিনী কি আপাততঃ শেষ?
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বরং, পেছন ফিরে একবার ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক।
একশো বছর আগে খোলা মাঠে তাঁবু খাটিয়ে সিনেমার শো হতো। আমাদের দেশে সিনেমার শুরুটা সেরকমই। সেখান থেকে সিনেমা এক সময় সরে এলো পাকাপোক্ত মুভি থিয়েটারে। ইন্ডাস্ট্রির আসল সাফল্য যাত্রা সেখান থেকেই আরম্ভ হলো। সুপারস্টার নায়ক নায়িকা, তারকা গায়ক গায়িকা, এবং অসংখ্য সেলেব্রিটিরা বিনোদন জগতের আকাশ জুড়ে ঝলমল করতে লাগলেন।
এরপর টেলিভিশন এলো। এলো ভিডিও ক্যাসেট এবং পাইরেসি। আশীর দশকে এসবের জ্বালাতনে, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসা কিন্তু আজকের এই করোনা সময়ের মতোই সঙ্কটে পড়ে গিয়েছিল। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো তারপর এলো সিডি, ডিভিডি। প্রথমে অরিজিন্যাল, তারপরে ডুপ্লিকেট। তারও পরে এলো টোরেন্ট। বলতে গেলে সিনেমার ব্যবসার ওপর একের পর এক যেন নতুন ভাইরাসের আক্রমণ! কিন্তু শেষ অবধি একটাই ভ্যাকসিনে সেই সব কয়টি ভাইরাস পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছিল। সেটা হলো, মাল্টিপ্লেক্সের ঝকঝকে ছবি, সাউন্ড আর এয়ার কন্ডিশনড আরাম। যার ম্যাজিকে পাইরেটেড ছবি দেখা ছেড়ে দর্শক আবার সিনেমা হলে ভিড় জমাতে শুরু করে দিয়েছিল।
অর্থাৎ, কঠোর সঙ্কটের মধ্যেও সিনেমা কিন্তু নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার একটা নতুন রাস্তা ঠিকই খুঁজে নিয়েছিল। এবং তারপর একসময় গিয়ে পৌঁছেছিল সাফল্যের নতুন শিখর…কোটি টাকার ক্লাব কালচারে! আজকের OTT প্ল্যাটফর্ম হয়তো সেরকমই একটা নতুন রাস্তা। সবে পথ চলা শুরু হলো বলে পুরো ইন্ডাস্ট্রি হয়তো এখনই তার জন্য লাভবান হতে পারছে না। কিন্তু ভবিষ্যতে কি হবে, সে কথা কে বলতে পারে? সিনেমার ফ্যান হিসেবে আমরা সবাই নিশ্চয় আশাবাদী থাকবো সেই ব্যাপারে!