২০-ই এপ্রিল-এর পর থেকে সারা ভারতে কোভিড পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছে। এই সেকেন্ড ওয়েভ নিয়ন্ত্রণে জারি হওয়া সরকারি বিধিনিষেধগুলির কারণে অরেঞ্জ ডিজিট্যাল-কেও কাজে সাময়িক ছেদ টানতে হয়েছে। তাই আমরা লাইভ স্ট্রিমিং এখন স্থগিত রেখেছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই আবার আমরা অনলাইন হবো। সহযোগিতার জন্য দর্শক বন্ধুদের ধন্যবাদ জানাই।.

ORANGE DIGITAL

রসে রঙ্গে তোমার সঙ্গে

অপর পরিচয়

গুণী মানুষদের জীবনের বিচিত্র কিছু বিষয় সম্বন্ধে জানতে চান? এখানে ক্লিক করুন।

ছিল রুমাল, হলো বেড়াল

স্কুল জীবনে অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তারা তিনজন। আর বড় হওয়ার পরে তিনজনেই হয়েছিলেন বাংলা সংস্কৃতি জগতের তিন দিকপাল।
তবে মজার ব্যাপার হলো, স্কুল জীবনে তাদের এক একজনের প্রতিভার যে প্রকাশ দেখা গিয়েছিল, পরবর্তী জীবনে তাদের সত্যিকারের প্রতিভা বিকাশ কিন্তু সে তুলনায় অন্য ধারায় বাঁক নিয়ে ফেলে। অর্থাৎ এতে যেমন অমিল রয়েছে, তেমনি মিল-ও খুঁজে পাবেন।
ভাবছেন, ব্যাপারটা কি রকম?
না না, বিরাট কিছু ধাঁধা নেই। আসলে খুবই সোজা ব্যাপারটা। মানে, যে বন্ধুটি স্কুল জীবনে গায়ক হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিলেন, তিনি কিন্তু পরিণত বয়সে বাংলা ভাষার একজন শক্তিশালী কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এদিকে যে বন্ধুটি স্কুল জীবনে খুব কবিতা লিখতেন, তিনি পরবর্তী কালে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন স্বনামধন্য লেখক ও গল্পকার হিসেবে। আর তৃতীয়জন তো ছাত্র জীবনে ছোট গল্প লেখার নেশায় বুঁদ থাকতেন। এমনকি তার কলেজ জীবনের লেখা একটি গল্প “দেশ” পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল। অথচ পরবর্তী কালে ভারত জুড়ে তার যে সুখ্যাতি হৈ হৈ করে ছড়িয়ে পড়লো, সেটা কিন্তু গায়ক এবং সুরকার হিসেবে।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, গায়ক ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং লেখক সাংবাদিক সন্তোষ কুমার দত্ত, তিনজনে ছিলেন স্কুল জীবনের সহপাঠী


আপনারা সবাই চেনেন বাংলার এই ত্রয়ীকে। প্রথমজন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দ্বিতীয়জন সাহিত্যিক সন্তোষ কুমার ঘোষ আর তৃতীয়জন হলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
তবে এটা হয়তো অনেকেরই জানা ছিল না যে এই তিন মূর্তি ছিলেন স্কুল জীবনের ক্লাস মেট। আর এটাও কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, — যে ঐ বয়সের যে তিনটি পছন্দের শখ ছিল এই তিনজনের, কর্ম জীবনে সেই তিনটি বিষয়কেই অদল বদল করে নিয়ে তারা যে যার আপন জীবনের লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছিলেন। এমন নজির কিন্তু সত্যিই দুর্লভ। আর সেই জন্যই এ তথ্য স্থান পেলো অরেঞ্জ ডিজিট্যালের “অপর পরিচয়”-এ। এরকমই আরও নানা বিচিত্র ব্যাপারে জানতে নজর রাখুন আমাদের পেজ-এ। পরবর্তী “অপর পরিচয়”-এর জন্য!

মেস বাড়ির বাতিল পোস্টকার্ড

শ্রীনিকেতন। ১৯২২ সাল। ভোর ৫-টার সময় কৃষিবিদ্যার ছাত্ররা রোজকার নিয়ম মাফিক মাঠে চলে এসেছে। তিন কাঠা করে জমি এক এক জনের জন্য বরাদ্দ। সার দিয়ে, জল দিয়ে সে জমিকে চাষযোগ্য করে তুলতে হবে তাদের। ফসল ফলাতে হবে হাতে কলমে!
সেই ছাত্রদের দলে রয়েছে কলকাতা থেকে আসা এক তরুণ। ছাত্র হিসেবে সে বরাবরই তুখোড়। কিন্তু জীবনে সিদ্ধান্তের বিষয়ে একটু যেন চঞ্চলমতিও!
স্কুল জীবনে হেড মাস্টার মশাই তার রেজাল্ট দেখে এত খুশী যে তাকে বিলেতে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন সেই কিশোরের চোখে স্বপ্ন, সে ময়দানের নামী ফুটবলার হবে! কিছুদিন সেই নিয়ে পাগলামোর পর, অবশেষে শখ বিসর্জন। এরপরে যখন উচ্চশিক্ষার সময় এলো, তখন একবার আর্টস নিয়ে এক কলেজে, পরে আবার সায়েন্স নিয়ে আরেক কলেজে সে ভর্তি হয়েছিল। এদিকে দেশ জুড়ে তখন জাতীয়তাবাদের ঢেউ চলছে। স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন সবার চোখে। তার প্রভাব যখন এই তরুণের ওপরে এসে পড়লো, তার মনে হলো তাকেও দেশ নির্মাণের কাজে লাগতে হবে। তাই কৃষিবিদ্যা শেখাই শ্রেয়। এই ভেবে হঠাৎই একদিন কলকাতার সব কিছু ছেড়ে ছুঁড়ে কপর্দকশূন্য দশায় সে কবিগুরু প্রতিষ্ঠিত শ্রীনিকেতনে এসে হাজির! নতুন করে তার ছাত্র জীবন শুরু হল সেখানে। রীতিমত ঘাম ঝরিয়ে রোদে জলে প্রতিদিন মাটির সঙ্গে চলছে নানা গুরুত্বপূর্ণ আদানপ্রদান। সে শিখছে ফসল ফলানোর ভাষা।
যদিও, জীবনের ভবিষ্যৎ মানচিত্রে কিন্তু এই খেয়ালী তরুণের জন্য ছকে রাখা ছিল সম্পূর্ণ অন্য পথের নকসা।
কিছুদিন বাদে এই তরুণকে দেখা গেল ঢাকা শহরে। ডাক্তারি পড়ার মনোবাসনা নিয়ে সেখানে এসেছে সে। সায়েন্স নিয়ে ভর্তিও হয়ে গেল সেখানকার জগন্নাথ কলেজে। কিন্তু বলাই বাহুল্য, তার জীবনের মানচিত্রে এটাও একটা ঘুরপথ মাত্র!

উতর ক্লকাতার মেসবাড়ি বাংলা সাহিত্য আর সিনেমায় বিশেষ স্থান পেয়ে এসেছে বিভিন্ন সময়ে

তাদের কলকাতার বসতবাড়ী তখন ভাড়া দেয়া রয়েছে। ফলে ছুটি ছাটায় ঢাকা থেকে ফিরলে তার আস্তানা হতো একটি মেসবাড়ি। এক অলস দুপুরে সেই মেসবাড়িতে এক জায়গায় প্রচুর বাতিল কাগজপত্র ডাই করা রয়েছে দেখে, কৌতূহল বশে সেগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করছিল সে। হঠাৎ হাতে উঠে এলো একটা বিবর্ণ পুরনো পোস্টকার্ড। গ্রামের কোনো বধূ এই মেসবাড়িতে বাসরত তার স্বামীকে বাড়ির খবরাখবর জানিয়ে চিঠি লিখেছে।
চিঠিটা পড়ে কেমন করে যেন গল্পের আইডিয়া চলে এলো সেই তরুণের মাথায়। এবং রাতারাতি একখানা নয়, দু দু খানা গল্প লিখে ফেললো সে। আর তারপরে গল্পের নীচে নিজের নাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখে, বুক ঠুকে সেই লেখা দুটো সে ডাক যোগে পাঠিয়ে দিলো তৎকালীন বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা “প্রবাসী”-র ঠিকানায়।
ঢাকায় গিয়ে কয়েক মাস অপেক্ষার পরে, ছাপার অক্ষরে নিজের নাম অবশেষে দেখতে পেল সে। অর্থাৎ, এতদিনে তার প্রথম পদক্ষেপ সম্পূর্ণ হলো, জীবনের মানচিত্রে বিধি নির্ধারিত রাস্তায় পথ চলার!
“কেরাণী” আর “গোপনচারিনী” এই দুটি গল্প শুধু যে “প্রবাসী”-তে প্রকাশিত হলো, তাই নয় গল্প দুটো নিয়ে লম্বা আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল সমসাময়িক আরেক সাহিত্য পত্রিকা “কল্লোল”-এ। কালক্রমে তারুণ্য ভরপুর এই পত্রিকার সুলেখকদের দলে নিজের স্থান অর্জন করে নিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। তার লেখা কবিতা প্রশংসা পেলো নজরুল ইসলামের কাছে। পরের কয়েক দশক ধরে বাংলা সাহিত্য এবং বাংলা সিনেমা, দু জায়গাতেই তিনি নিজের প্রতিভার প্রতিপত্তি বিস্তার করে চললেন অক্লেশে!
আর সেই মেসবাড়ি? যেখানে বসে ওই প্রথম গল্প দুটো লেখা? সেই মেসবাড়িই মনে হয় তার ঘনাদা সিরিজের অতি বিখ্যাত কাহিনীগুলোতে বর্ণিত মেস বাড়িটির মূল অনুপ্রেরণা!